এভারেস্ট অভিযান সম্পর্কে

পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থানটিতে যেতে কার  না মন করে , কিন্তু সবার পক্ষে তো হয়ে ওঠে না। কিন্তু পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থান  সম্পর্কে জানার আগ্রহ নেই এমন ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া যাবে না। এভারেস্ট সম্পর্কে আমরা এখনো কতটুকুই বা জানতে পেরেছি? খুবই অল্প, এবং বিভিন্ন গবেষক এখনো হিমালয় পর্বত ও তার সর্বোচ শৃঙ্গ সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেই চলেছে। একসময়ের টেথিস সমুদ্র আজ সুবিশাল হিমালয় পর্বতে পরিণত হয়েছে ভারতীয় ট্যাকটোনিক প্লেট এশিয়ান প্লেটের দিকে ক্রমাগত এগিয়ে যাওয়ার ফলে।  ভাঁজ হয়ে উঠে গেছে বহু দিনের সমুদ্রের তলায় জমে থাকা পাললিক শিলা। সৃষ্টি হয়েছে এক অনন্য সুন্দর রূপ । ঠিক যেন ভারতের মুকুট। যদিও এভারেস্ট শৃঙ্গটি ভারতের মধ্যে পড়ে না, পড়ে নেপালের মধ্যে।

এভারেস্ট এর প্রতি কেন এত মানুষ  আকৃষ্ট হয়ঃ

এর কারণ হল তার অপরূপ সৌন্দর্য এবং তার উচ্চতা। পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থানটিতে পা রাখার সম্মানটাও অনেক বড়। বরফ ঢাকা  প্রকৃতির এই শুভ্র সৌন্দর্য আর

উচ্চতমকে জয় করার আনন্দের হাতছানি মানুষকে আকৃষ্ট করেছে অতীতেও এবং আগামিদিনেও করে যাবে।

মাউন্ট এভারেস্ট

 

অবস্থানঃ

এই পর্বতশৃঙ্গটি অবস্থিত বিশাল হিমালয় পর্বতমালার প্রায় মধ্যভাগে, নেপালের মধ্যে তিব্বতের সীমা লাগোয়া। এভারেস্ট ছাড়াও হিমালয়ে আরো অনেক উঁচু উঁচু পর্বতশৃঙ্গ আছে। যেমন গডউইন অস্টিন বা K-2,  কাঞ্চনজঙ্গা, লোতসে, মাকালু ইত্যাদি। এই হিমালয় শুধু বিশ্বের সবচেয়ে বড় পর্বতমালা তা নয়, এটা পৃথিবীর পর্বতমালাগুলির মধ্যে নবীনতম। মাত্র পাঁচ কোটি বছর আগে এর জন্ম।

অন্যান্য নামঃ

হিমালয় তথা বিশ্বের  উচ্চতম শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট  নেপালে সাগরমাথা, তিব্বতে চোমোলুংমা, ও চীনে কমোলাংমা ফেং বা জমুলাংমা ফেং নামে পরিচিত।

তিব্বতি ভাষায় চোমোলুংমা কথার অর্থ পৃথিবীর মা। এত উঁচু শৃঙ্গ মাথা তুলে যেন মায়ের মতো  সবার উপর নজর রাখছে, তাই তিব্বতিরা এইরকম নাম দিয়েছিল।

পূর্ব পরিচয়, নামকরণ উচ্চতাঃ

আগে এভারেস্টকে বলা হত B-শৃঙ্গ। 1841সালে তখনকার ভারতের সার্ভেয়ার জেনারেল Sir George Everest এটির অবস্থান মানচিত্রর মধ্যে চিহ্নিত করেন। 1856 সালং এর উচ্চতা মাপা হয়েছিল 29002 ফুট ( 8840 মিটার)।

এর উচ্চতা কত এই নিয়ে  চীন বনাম নেপালের দীর্ঘ ঝগড়ার পর শেষে ঠিক হয় এটির উচ্চতা 290029 ফুট( 8846 মিটার)। এর চুড়ার উপর আছে 13 ফুট  (4 মিটার) পুরু বরফের আস্তরন। যদিও ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটি অবশ্য বলেছে  এর উচ্চতা আর একটু বেশি, 290035 ফুট বা 8850 মিটার।

1865 সালে George Everest নাম অনুসারে এই শৃঙ্গের নাম  রাখা হয়েছিল।

এভারেস্ট অভিযানের কিছু ইতিহাসঃ

1921 সালে তিব্বতের 400 কিলোমিটার দুর্গম এলাকা পেরিয়ে একজন ব্রিটিশ পর্বতারোহী জর্জ লিগ মেলোরি এভারেস্টে ওঠার চেস্টা করেছিলেন, কিন্তু ঝড়ের কবলে পড়ে সেই অভিযান ব্যর্থ হয়। কিন্তু এরপর বারবার বিভিন্ন ব্যক্তি পর্বতারোহনের সাহস পান। 1922 সালে জর্জ ফিঞ্চ ও জিওফ্রে ব্রুশ 27000 ফুট উচ্চতা পর্যন্ত পৌছালেও আর উপরে যেতে পারেননি।

সেই বছরেই ম্যালোরি আবার  উঠার চেস্টা করলে  অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়াই 8225 মিটার পর্যন্ত উঠেন কিন্তু তার  7 জন শেরপা সাথী বরফ ধসে নীচে পড়ে গেলে সেই যাত্রা সেখানেই শেষ হয়।

1924 সালে ব্রিটিশ পর্বতারোহী ম্যালোরি আবার এন্ড্রু ইভরিনের সাথে এভারেস্ট পাড়ি দেন, কিন্তু চুড়া থেকে মাত্র 800 ফুট বা 245 মিটার নীচ থেকে তারা বরফ ধসের মধ্যে হারিয়ে যান। 75 বছর পর  1st May, 1999 সালে তার মৃতদেহ উদ্ধার হয়।

উত্তরপূর্ব ঢালে তিব্বতের রাস্তা দিয়ে  আরো অনেক ব্যর্থ প্রচেস্টা জারি থাকে।  দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ওই রাস্তা বিদেশীদের জন্য বন্ধ হয়ে যায়।

এরপর 1949 সালে নেপাল বিশ্বের কাছে এভারেস্ট এর দরজা খুলে দেয়। 1950 ও 1951 সালে দক্ষিন ঢাল বরাবর  অনেকবার শৃঙ্গে উঠার চেষ্টা করা হয়।

1952 সালে তেনজিং নোরগে ও রেমন্ড ল্যাম্বার্ট 28210 ফুট পর্যন্ত উঠেন, কিন্তু উপযুক্ত উপকরণের অভাবে তারা সেখান থেকেই নীচে নামার সিদ্ধান্ত নেন।

তেনজিং নোরগে এডমন্ড হিলারির এভারেস্ট জয়ঃ

1953 সালের এপ্রিল মাসে তেনজিং নোরগে, এডমন্ড হিলারি সহ জিল্যান্ডার জর্জ এবং আরো কিছু প্রশিক্ষনপ্রাপ্ত ব্রিটিশ পর্বতারোহী  কোলোন্যাল জন হান্ট এর নেতৃত্ত্বে উপযুক্ত পোষাক, অক্সিজেন বোতল এবং রেডিয়ো এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সহযোগে আবার এভারেস্ট পাড়ি দেন।

26 শে মে 1953 তে  চূড়ার প্রায় 300 ফুট দূরে পৌছানোর পর অক্সিজেন বোতল লিক করলে সেখান  থেকেই চার্লস ইভান ও টম বর্ডিলন নীচে নামার সিদ্ধান্ত নেন।

28 শে মে 1953, তেনজিং ও এডমন্ড 27900 ফুটে ক্যাম্প করে বিশ্রাম নেন এবং সেখানে অত্যন্ত শীতের মধ্যে এক বিনিদ্র রাত্রি কাটানোর পর  পরের দিন সকাল 9 টার সময় সাউথ সামিটে এবং একটা 40 ফুট উঁচু খাড়া পাথরের সামনে এসে পৌছান, যা এখন হিলারি পয়েন্ট নামে পরিচিত। সেই বড় বাধা পেরিয়ে 11 টা 30 এর সময় এডমন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগে প্রথমবার পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু স্থানটিতে পা রাখেন।

এরপর ধীরে ধীরে এভারেস্ট জয়ীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। এখন  এভারেস্ট এর চূড়ায় ঊঠা অনেকটাই সহজ হয়ে গেছে, নীচ থেকে চূড়া পর্যন্ত দড়ি লাগানো আছে। এখন প্রতি বছর প্রায় 300 জন নতুন পর্বতারোহী  সহ আরো  300 জন শেরপা এভারেস্ট এর চূড়ায় পৌছান।

এভারেস্ট অভিযান সংক্রান্ত আরো কিছুর  তথ্যঃ

অনেক উচ্চতার কারনে সেখানে বাতাসের ঘনত্ব অনেক কম থাকে এবং একই কারণে উপরের উষ্ণতাও ভয়ানক রকমের কম। সর্বনিম্ন  -80 ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে সর্বোচ্চ  -20  ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত হয়।

পাদদেশ থেকে চূড়ায় ঊঠতে এখন প্রায় 40 দিন সময় লাগে।  শেরপাদের অনেক এজেন্সি আছে যারা টাকার বিনিময়ে চূড়াতে উঠার সব ব্যবস্থা করে দেয়। মাথাপিছু এর জন্য গড়ে 40000 ডলার বা ভারতীয় টাকাতে প্রায় 30 লক্ষ টাকা খরচ হয়।  এর জন্য অবশ্য আপনাকে শারীরিকভাবে ফিট থাকতে হবে ও পর্তারোহনের প্রাথমিক অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

Prayer Flag

সবাই হিমালয়ের পাদদেশে থুম্বুতে মূল ছাউনিতে কিছুদিন বিশ্রাম নেয় বা মানসিকভাবে প্রস্তুতি নেয়, শেরপারা তাদের রীতি রেওয়াজ অনুযায়ী কিছু অনুষ্ঠান করে। তারপর সমস্ত এজেন্সি প্রায় একইসাথে তাদের নিজের নিজের যাত্রীদেরকে নিয়ে পর্বতারোহন শুরু করে। এইসময় এভারেস্ট এর গোড়াটা ঠিক মেলার মতো লাগে, প্রায় সাত-আটশো লোক একসাথে এভারেস্টে উঠতে শুরু করে।

বিভিন্ন উচ্চতায় আরো ক্যাম্প করা হয় বিশ্রাম নেওয়ার জন্য। সর্বশেষ ক্যাম্পটি 8300 মিটার উচ্চতায় অবস্থিত, কিন্তু সেখানেও ঠান্ডা এবং ঝোড়ো হাওয়া এত বেশি যে থাকা প্রায় দুঃসাধ্য। তার উপরে আর কোনো ক্যাম্প করা যায় না বা বিশ্রাম নেওয়ার উপায়ও নেই এবং ওই উচ্চতাটাকে ডেথ জোন বলা হয় । বাকি 500 মিটার চড়াই বিনা বিশ্রামেই করতে হয়।

 অ্যাডভেঞ্চার

শৃঙ্গে উঠতে গেলে বিপদ অবশ্যই আছে। অনেকসময় বরফ ধ্বসে মারাত্মক দুর্ঘটনা ঘটে। তাছাড়া হটাৎ তুসার ঝড়ের সম্ভাবনাও মাঝে মাঝে বিপদে ফেলে।

কিন্তু মানুষ কঠিন কাজে সফল হলেই বেশি আনন্দিত হয়। এভারেস্ট এর চূড়ায় ওঠা কঠিন তো বটেই তার সাথে রোমাঞ্চকরও বটে। তাইতো সবার এত আকর্ষন ওই শুভ্র সৌন্দর্যের প্রতি।

এভারেস্টে প্রথম

1921 সালে তিব্বতের উত্তর দিক থেকে সর্ব প্রথম একজন ব্রিটিশ পর্বত আরোহণের চেষ্টা করে ব্যার্থ হন।

1899 সালে সর্বপ্রথম এভারেস্টের উচ্চতা নির্ণয় করা হয়।

1948 সালে সর্বপ্রথম শারীরিক ভাবে অক্ষম ব্যাক্তি হিসেবে নিউ ইয়র্কের টম হুইটকার পর্বত আরোহণ করেন।

1974 সালে প্রথম অক্সিজেন ছাড়া পর্বতারোহী ইতালির রেইনহোল্ড মেসনার ও তার সঙ্গী পিটার হাবলার।

প্রথম ভারতীয় হিসাবে  এভারেস্ট এর শীর্ষে পৌছান অবতার সিং চিমা।

প্রথম যুগল হিসাবে তাশি ও নুঙ্গশী মালিক একসাথে এভেরেস্টের চূড়ায় উঠে।

প্রথম নারী হিসাবে  চূড়ায় উঠেন জুনকো তাবেই।

প্রথম ভারতীয় নারী হিসাবে এভারেস্ট এর শীর্ষে উঠেছিলেন বাচেন্দ্রী পাল।

প্রথম বাঙ্গালী হিসাবে এভারেস্ট জয় করেন সত্যব্রত দাস।

প্রথম বাঙ্গালী নারী হিসাবে এভারেস্ট জয় করেন শিপ্রা মজুমদার।

সবচেয়ে বেশি বয়সী ব্যাক্তি জাপানের ইউচিরো মিউরায় 2013 তে পর্বত আরোহণ করেন , বয়স  80।

মার্কিন যুক্তরাজ্যের জর্দান রোমেরো একই বছর 2013 তে পাহারের চূড়ায় উঠে সবচেয়ে কম বয়সের ব্যাক্তি হিসাবে বয়স  13 বছর।

কেন্টন কুল নামের একজন হাইকার সর্বপ্রথম এভেরেস্টের শীর্ষ থেকে ‘দি উইক সিগন্যালের’ মাধ্যমে  টুইটারে  টুইট করেন।

2005 সালে এভারেস্টের শীর্ষ স্থানে সর্বপ্রথম এক নেপালি দম্পতি বিয়ে করেছিল। তারা বিয়ের আনুষ্ঠানিকতার জন্য মাত্র  10 মিনিটের জন্য এভেরেস্টের শীর্ষে অবস্থান করেছিল।

  কিছু অজানা তথ্য

  • 2019 সালের মে মাস পর্যন্ত মোট 5780 জন এভারেস্টের শীর্ষে উঠেছেন।   ( তথ্যসূত্রঃ – Hexapedions ) এই ওয়েবসাইটে সমস্ত অভিযাত্রীর নাম, দেশের নাম, বয়স, পেশা, কোন তারিখে এভেরেস্টের চূড়ায় পৌছেছিল, কোন পথ দিয়ে উঠেছিল তার সমস্ত বিবরণ পাওয়া যাবে।
  • কামি রিতা শেরপা সবচেয়ে বেশি সংখ্যক এভারেস্টের শীর্ষে উঠার রেকর্ড অর্জন করেন ( 2019 এর মে মাস পর্যন্ত 24 বার) । ( বিঃ দ্রঃ- 2020 তে কোভিড-19 এর জন্য কোনো অভিযান হয়নি। )
  • Everest Day প্রতিবছর পালিত হয় 29 শে মে তারিখে, এডমন্ড হিলারি ও তেনজিং নোরগের প্রথম সাফল্যের দিনটাকে ধরে।

error: Content is protected !!