ক্ষুদিরাম বসু 

ক্ষুদিরাম বসু 

এক নির্ভীক স্বাধীনতা সংগ্রামী, আজকের দিনে অর্থাৎ ১১ই আগস্ট ১৯০৮ সালে ইংরেজদের দ্বারা মৃত্যুদন্ডে দন্ডিত হন। সেই সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৯ বছর। কি এমন করেছিলেন তিনি যার জন্য তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল ইংরেজরা?

ইংরেজ শাসন ভারতে যখন চরম পর্যায়ে পৌছে গেছে, তাদের অত্যাচার ও শোষন যখন সহ্যের সীমা অতিক্রম করছে তখন বাংলার বুকে এই রকম একজন কিশোরের আবির্ভাব, যিনি হয়তো একা কিছুই করতে পারতেন না কিন্তু ইংরেজদের বিরুদ্ধে তার লড়াই করার ইচ্ছা, দেশমাতৃকার প্রতি ভালোবাসা ও দেশকে স্বাধীন দেখার জন্য এগিয়ে গিয়েছিলেন চরম উচ্ছাসে এবং আলোড়ন সৃষ্টিকারী পদক্ষেপ নিয়ে নিজের জীবনের বিনিময়ে দেশকে স্বাধীনতার দিকে আরো এক পা এগিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন এবং আমাদের মনে আজও অমর হয়ে আছেন ক্ষুদিরাম বসু।

ক্ষুদিরাম বসু ১৯৮৯ সালে ৩রা ডিসেম্বর মেদিনীপুর জেলার  কেশপুর থানার মোহবনী গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতা ছিলেন ত্রৈলক্যনাথ বসু, মাতা লক্ষীপ্রিয় দেবী। ক্ষুদিরাম বসু ছিলেন তার পিতামাতার চতুর্থ সন্তান, তার ছিল তিনজন বড় দিদি। তার চেয়ে বড় দুই ভাই বড় হওয়ার আগেই মৃত্যুবরন করেন। তখন তার মা পুত্র হারানোর আশঙ্কায়  তখনকার সমাজের রীতি অনুযায়ী তার বড় দিদির কাছে তিন মুঠো খুদের বিনিময়ে তাকে বিক্রি করে দেন। খুদের বিনিময়ে ক্রয় করা সন্তানের জন্যই তার নাম ক্ষুদিরাম রাখা হয়।

অরবিন্দ ঘোষ

অনেক ছোটবেলা থেকেই বিপ্লবী দলগুলোর প্রতি তার বিশেষ আকর্ষন ছিল। এবং অরবিন্দ ঘোষের মতো স্বশস্ত্র বিপ্লবীর সাথে তার যোগাযোগ ঘটে এবং তারই মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হন এবং স্বশস্ত্র বিপ্লবের দিকে ঝুকে পড়েন।

ক্ষুদিরাম বসু তমলুকের হ্যামিলটন স্কুল ও তারপরে মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে পড়াশোনা করেন।

বিপ্লবীদের গুপ্ত মিটিং

মেদিনীপুরে তাঁর বিপ্লবী জীবনের শুরু হয়। সেখানে একটি নতুন শুরু হওয়া বিপ্লবী দলে তিনি যোগ দেন। ১৯০২ সালে জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু ও রাজনারায়ন বসুর ছত্রতলে মেদিনীপুরে একটি গুপ্ত  বিপ্লবী সমিতি গড়ে ওঠে । সেই সমিতির নেতা ছিলেন হেমচন্দ্র দাস কানুনগো ও তার সহকারী ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ বসু।  মেদিনীপুরে ব্রিটিশবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় লোক এই সমতির সাথে যুক্ত ছিল এবং ক্ষুদিরাম বসু খুব অল্প দিনের মধ্যেই অনুপ্রাণিত হয়ে এই সমিতিতে যোগ দেন।  সত্যেন্দ্রনাথ বসুর কাছে তিনি বিপ্লবের হাতেখড়ি নেন। যোগ দেওয়ার সাথে সাথেই দেশের জন্য তার কাজ করার ইচ্ছা এবং প্রবণতা, বিভিন্ন কাজে তার পারদর্শীতা দেখে খুব সহজেই তিনি সবার নজর কাড়েন ও সবার প্রিয় হয়ে ওঠেন। এরপর “সোনার বাংলা” নামক বিপ্লবাত্মক ইস্তেহার বিলি করতে গিয়ে ইংরেজদের হাতে গ্রেফতার হন।

কিছুটা শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা ও বাকিটা তার বিপ্লবের গুরু সত্যেন্দ্রনাথের কাছ থেকে শিখে ব্রিটিশ উপনিবেশরাজের বিরুদ্ধে সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়তে অনুপ্রাণিত হন। পরে তিনি যুগান্তর দলেও যোগ দিয়েছিলেন। ক্ষুদিরাম বসু ১৬ বছর বয়সে পুলিশ স্টেশনের কাছে বোমা পুঁতেন এবং এবং ইংরেজ অফিসারদের উপর নজর রাখতে শুরু করেন। একের পর এক বোমা পুঁততে গিয়ে তিনি ধরা পড়ে যান ও তিন বছর তাকে জেলে আটকে রাখা হয়।

৩০ শে এপ্রিল  ১৯০৮ সালে ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকি বিহারের মুজাফফর নগরে ইউরোপিয়ান ক্লাবের সামনে ধূর্ত ইংরেজ অফিসার কিংসফোর্ডকে হত্যা করার জন্য ওঁত পেতে থাকেন, কিন্তু সেদিন কোনো কারণে ওই ইংরেজ অফিসার তার গাড়িতে আসেননি, বদলে অন্য একটি পরিবার এসেছিল। রাত্রি আটটায় অন্ধকারে কিংসফোর্ড ভেবে তিনি গাড়ির ওপর বোমা ফাটালে দুইজন ইংরেজমহিলা  মিসেস কেনেডি ও তার কন্যার মৃত্যু হয় । পালানোর উপায় না দেখে প্রফুল্ল চাকি ঘটনাস্থলেই আত্মহত্যা করেন  ও ক্ষুদিরাম বসু ধরা পড়ে যান। ২১ শে মে ১৯০৮ সালে আলিপুর আদালতে ওই হত্যার মামলা শুরু হয় যা আলিপুর বোমা মামলা নামে পরিচিত। বিচারক ছিলেন জনৈক বৃটিশ মিঃ কর্নডফ  এবং দুইজন ভারতীয় লাথুনিপ্রসাদ ও জ্ঞানকিপ্রসাদ।

১৯০৮ সালের ১১ই আগস্ট ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসি হয়। তার ফাঁসির দিন বয়স ছিল ১৮ বছর ৭ মাস ১১ দিন। তার ফাঁসির পর ভারতীয় যুবসমাজ ইংরেজদেরকে দেশ থেকে তাড়ানোর জন্য বিপ্লবপন্থী হতে আরো বেশি অনুপ্রাণিত হয়। তার সম্পর্কে অনেক গান ও কবিতা লেখা হয় যার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় গান “ একবার বিদায় দে মা, ঘুরে আসি// হাসি হাসি পরব ফাঁসি দেখবে ভারতবাসী”- গানটি পীতাম্বর দাসের বা মতান্তরে মুকুন্দ দাসের রচনা।

মৃত্যুর ভয়কে তুচ্ছ করে প্রবল সৎসাহসে দেশমাতার প্রতি তার সমর্পণ বাঙালী তথা পুরো ভারতবর্ষ মনে রাখবে। তিনি ছিলেন অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদী ও অন্যের দূঃখের সময় সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসার জন্য সদা প্রস্তুত। তিনি ছিলেন একজন যথার্থই দেশপ্রেমিক। তাই তো ক্ষুদিরাম বসু নাম এখনো আমাদের মনে স্বাধীনতা সংগ্রামের তাজা স্মৃতি পুনরোজ্জীবিত করে!

error: Content is protected !!