পরমাণুর অভ্যন্তরে

ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিক পর্যন্ত মানুষের তথা বিজ্ঞান মহলেও ধারণা ছিল যে পদার্থ একধরনের অবিভাজ্য নিরেট কণা দ্বারা গঠিত যাদের আমরা পরমাণু বলে জানি। কারণ এই ধারণা এসেছিল ডালটনের মতবাদ থেকে।

কিন্তু ১৮৯৭ সালে বৃটিশ বিজ্ঞানী জে জে থমসন প্রায় বায়ুশূন্য নলের মধ্য দিয়ে উচ্চ বিভব চালনা করতে গিয়ে নতুন একধরণের কণার খোঁজ পান, এবং এই কণার নাম দেওয়া হয় ইলেকট্রন। এর থেকে বোঝা যায় পরমানু অবিভাজ্য নয়। এবং বিজ্ঞানীরা এই বিষয়ে গবেষনাতে আরো উৎসাহিত হয় এবং খুব শীঘ্রই বিজ্ঞানীদের নজরে আসে যা নিস্তড়িৎ পরমাণুতে যদি ঋণাত্মক আধানযুক্ত ইলেকট্রন থাকে তাহলে নিশ্চয়ই ধনাত্মক আধানযুক্ত কোনো কণাও পরমানুর মধ্যে থাকবে। এর ফলে প্রোটনের ধারণা আসে এবং বিজ্ঞানী রাদারফোর্ড তার আলফা কণা বিচ্ছুরণ পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমাণ করে পরমাণুর কেন্দ্রে প্রোটনগুলি অবস্থান করে এবং পরমণুর বেশিরভাগ অংশই ফাঁকা। তার কিছুদিনের মধ্যেই পরমাণুর ভর সংক্রান্ত হিসাবে গরমিল দেখা দিলে নতুন আর এক প্রকার কণার ভাবনা আসে এবং বিজ্ঞানী স্যাডউইক প্রোটনের ভরের থেকেও সামান্য বেশি ভরযুক্ত নিউট্রন আবিষ্কার করেন।

অন্যদিকে ১৮৯৫ সাল নাগাদ বিজ্ঞানী রন্টজেন কাঁচের  নলে বিদ্যুত প্রবাহ করতে গিয়ে লক্ষ্য করেন ফটোগ্রাফিক প্লেটে কুয়াশার মতো মতো ছাপ পড়েছে। উনি বুঝলেন সেটা কোনো এক অদৃশ্য রশ্মি যার ভেদন ক্ষমতা সাধারণ আলোর চেয়ে অনেক  বেশি। উনি ওই রশ্মির নাম দিলেন X-রশ্মি। পরমাণুর গঠন কেন্দ্রকের ধর্ম সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যা কিছু জানতে পেরেছেন তারই পরিণতি হল নিউক্লিয়ার ফিশন নিউক্লিয়ার ফিউশন।

১৮৯৬ সালে ফরাসী বিজ্ঞানী হেনরি বেকারেল কুরি দম্পতি আবিষ্কার করেন যে, কোনো কোনো ভারী পরমাণু কেন্দ্রক স্বতস্ফূর্তভাবে ভেঙ্গে ছোটো নিউক্লিয়াসে পরিণত হয় এবং এর ফলে প্রচুর শক্তি নির্গত হয়। এই ধর্মকে মৌলের তেজষ্ক্রিতা বলা হয়। এর ফলে বিজ্ঞানীরা উপলব্ধি করেন যে পরমাণুর মধ্যে বিপুল পরিমাণে শক্তি নিহিত আছে। একে নিউক্লিয় শক্তি বলা হয়। এই নিউক্লিয় শক্তির উৎস কি?

 ১৯০৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন তাঁর আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্বের মাধ্যমে এর   ব্যাখ্যা দেন।  এবং যুগান্তকারী সমীকরণ  

E= mc2  এর অবতারনা করেন।

অর্থাৎ m ভরের কোনো পদার্থ যদি সুম্পূর্ণরূপে শক্তিতে পরিণত হয় তবে mc2 পরিমাণ শক্তি উদ্ভুত হবে। ( c = আলোর বেগ  যার মান সেকেন্ডে তিন লক্ষ কিলোমিটার) এক গ্রাম ভর শক্তিতে রূপান্তরিত হলে  প্রায় দুই কোটি পঞ্চাশ লক্ষ কিলোওয়াট ঘন্টা পরিমাণ শক্তি উৎপন্ন হবে। বিজ্ঞানের ইতিহাসে এই সমীকরণ ভর শক্তির তুল্যতা নামে পরিচিত।

বর্তমান শতকের প্রথম তিন দশকের গবেষনা থেকে পরমাণু নিউক্লিয়াসের  গঠন তিনটি মূল কণিকা ইলেকট্রন, প্রোটন নিউট্রনের আনেক ধর্ম জানা যায়। তখনই ধরা পড়ে যে খুব হালকা বা খুব ভারী নিউক্লিয়াসের ভর তার অন্তর্গত মূল কণাগুলোর মোট ভরের তুলনায় সামান্য কম। অর্থাৎ কণিকাগুলো একসাথে থাকার ফলে কিছু পরিমাণ ভর শক্তিতে পরিণত হয়েছে। যদি কণিকা গুলো কোনোভাবে হটাৎ করে আলাদা করা হয় তাহলে ওই বিপুল পরিমাণ শক্তির  মুক্তি ঘটবে।

পরমাণুর গঠন আমাদের সৌরজগতের মতোই, মাঝখানে নিউক্লিয়াস ঠিক সূর্যের মতো। পরমাণুর দুটি অংশ। ক্রমাগত পাক খাওয়া ইলেকট্রন  এবং এবং পরমাণুর মাঝে নিস্তড়িৎ নিউট্রন ধনাত্মক আধানযুক্ত প্রোটনকে নিয়ে নিউক্লিয়াস, যাকে কেন্দ্র করেই ইলেকট্রনগুলো অবিরাম আবর্তন করে। এই ইলেকট্রনগুলো এত বেশি গতিতে আবর্তন করে যে বাইরে থেকে মনে হবে যেন ইলেকট্রনগুলো পরমাণুর চারিদিকে একটা আস্তরন তৈরী করে রেখেছে এবং পরমাণুকে এভাবে দেখতে দেখতে পেলে নিরেট মনে হতেই পারে, যদিও খালি চোখে কখনও পরমাণু দেখা সম্ভব নয়। একটা ঘুরন্ত ফ্যানকে দেখলে যেমন মনে হয় তার পাখা গুল সমস্ত যায়গাতেই আছে ঠিক সেইরকমভাবেই। কিন্তু ইলেকট্রনের গতির সামনে ফ্যানের গতি কিছুই নয়।

পরমাণুর গঠন ঠিক এরকম যে যতগুলি প্রোটন থাকে ঠিক ততগুলিই ইলেকট্রন থাকে। এবং প্রতিটি ইলেকট্রনপ্রোটনের আধানের পরিমাণ সমান হয় কিন্তু প্রোটনের ধনাত্মক আধান ইলেকট্রনের ঋণাত্মক আধান হওয়ার জন্য পরমাণু নিস্তড়িৎ হয়। নিউট্রনে কোনো তড়িৎ থাকে না। প্রতিটি মৌলিক পদার্থে থাকে নির্দিষ্ট সংখ্যক প্রোটন, এটিই পরমাণুর মৌলিক পরিচয়। যেমন হাইড্রোজেনে একটি, হিলিয়ামে দুটি, কার্বনে ছটি, অক্সিজেনে আটটি,  ইউরেনিয়ামে বিরানব্বইটি।   ইলেকট্রন প্রোটন সমান সংখ্যায় থাকলেও নিউট্রন সংখ্যার কোনো নির্দিষ্টতা নেই, এবং একই মৌলেরই একাধিক রকমের নিউট্রন সংখ্যা যুক্ত পরমাণু পাওয়া যায়। যেমন ইউরেনিয়াম কখনও একশ তেতাল্লিশটি , কখনও একশ ছেচল্লিশটি নিউট্রনযুক্ত হয়   নিউট্রন আর প্রোটন সংখ্যাকে যোগ করে এদের একটাকে বলা হয় U235  অন্যটিকে U238 , এগুলি ইউরেনিয়ামের দুটি আইসোটোপ।

এদিকে ভারতে অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বসু জগৎবিখ্যাত ম্যাক্সপ্লাঙ্ক কোয়ান্টাম থিওরির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আবিষ্কার করলেন বিশ্বের তাবৎ মৌলিক কণাগুলি দুইজাতেরবসুর নামানুসারে এক জাতের নাম বোসন( ফোটন, মেসন,গ্রাভিট্রন ইত্যাদি) আর অন্য জাতের নাম ফের্মিয়ন ( ইলেকট্রন, মিউওন, নিউক্লিয়ন, বেরিয়ন ইত্যাদি)

পরমাণুর গঠন আকৃতি সম্পর্কে নিখুঁত ধারণাটি দিলেন বিজ্ঞানী নীলস বোর। তিনিই জানালেন, সৌরজগতের সঙ্গে পরমাণুর তুলনায় যে কথাটি তুলনাযোগ্য তা হল সৌরজগতের এক একটি কক্ষপথে থাকে একটিই গ্রহ। কিন্তু পরমাণুর এক একটি কক্ষে থাকতে পারে একধিক ইলেকট্রন। এছাড়াও ইলকট্রনের কক্ষপথগুলি বৃত্তাকার। তিনি হিসাব করে দেখলেন প্রথম কক্ষপথে  দুটি, দ্বিতীয় কক্ষপথে আটটি বা তৃতীয় কক্ষপথে আঠারোটির বেশি ইলেকট্রন থাকতে পারে না। অধ্যাপক বোর আরও জানালেন, যেখানে যেখানে কক্ষপথ পূর্ণ হয়েছে সেই মৌলগুলি স্থিতিশীল, তারা রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহন করতে পারে না।

এর মধ্যেই মাদাম ম্যারি কুরির মেয়ে আইনিন কুরি তার স্বামী ফেড্রিক জোলিও বোরনের একটি আইসোটোপের উপর হিলিয়ামের আয়নের আঘাত ঘটিয়ে আবিষ্কার করেন বোরন পরমাণুর নিউক্লিয়াস থেকে একটি বিটাকণা  মুক্ত হয়ে গেছে এবং এই কারনেই রাদারফোর্ড নিউক্লিয়াস বিশ্লেষন করতে গিয়ে  নাইট্রোজেন পরমাণু থেকে অক্সিজেন পরমাণু পেয়েছিলেন।

পদার্থের মৌলিক পরিবর্তনে যে প্রচুর পরিমানে শক্তি উদ্ভুত হতে  এবং পরমাণুকে ক্রমাগত ভাঙা গেলে প্রচন্ড শক্তিশালী বিস্ফোরণ হতে  পারে এই ঘোষনা সর্বপ্রথম এই কুরি দম্পতিই করেন।

১৯৩৩ সালে বুদাপেষ্ট এর জিলার্ড প্রমাণ করেন , যদি এমন একটা ব্যবস্থা করা যায় যাতে ক্রমান্বয়ে একের পর এক নিউট্রন মুক্তি পাবে একটা শৃঙ্খল বিক্রিয়ার মাধ্যমে, তাহলে সেক্ষেত্রে পুঞ্জিভুত শক্তি অকল্পনীয় হয়ে ঊঠবে। তিনিই প্রথম শৃঙ্খল বিক্রিয়াতে ইউরেনিয়াম ব্যবহারের কথা ভাবেন।

এদিকে ইতালির এনরিক ফের্মি নিউট্রন দিয়ে পরমাণুর নিউজক্লিয়াসকে আঘাত করতে সক্ষম হলেন এবং আবিষ্কার করলেন নিউট্রন দিয়ে পরমাণুকে প্রচন্ডভাবে আঘাত করলে কৃত্রিম তেজস্ক্রিয়তা তৈরী হয়। তিনি ফ্লুরিন নিয়ে পরীক্ষা করেন। ইউরেনিয়াম নিয়ে পরীক্ষা করেও তিনি নিউক্লিয়াসকে ভাঙতে সফল হয়েছিলেন।

যখন এই আবিষ্কারকে বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী অটো হান পর্যন্ত মেনে নিতে পারছিলেন না, জার্মান দম্পতি ইডা নোডাক আর কুরি দম্পতি আইরিন জোলিয়ো তা মেনে নিয়েছিলেন। বস্তুতঃ কুরি দম্পতি ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াসে নিউট্রন বোম্বার্ড করে রিয়েকশনের পর রিয়েকশনে বার বার  নিউক্লিয়াস ভাঙতে সফল হয়েছিলেন।

বিজ্ঞানী অটো হান ইউরেনিয়াম২৩৫ নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখেনে যে পরমাণুটির নিউক্লিয়াস দুটুকরো হয়ে গেল এবং নতুন নিউক্লিয়াসকে কেন্দ্র করে প্রোটনের সমান সংখ্যক ইলেকট্রনও বিভাজিত হয়ে নতুন নিউক্লিয়াসগুলিকে আবর্তন করতে লাগল। আবং সেই সাথে তিনটি নিউট্রন বিচ্ছিন্ন হয়ে এদিক ওদিক চলে গেল এবং তার সাথেই সৃষ্টি হল প্রচন্ড শক্তি।

ভরের হিসাব থেকে জানা যায় প্রতি বিভাজনে ২০০.  মিলিয়ন ইলেকট্রন ভোল্ট শক্তি উৎপন্ন হয়। মাত্র একগ্রাম ইউরেনিয়াম থেকে ২২.৮০০ কিলোওয়াট ঘন্টা শক্তি পাওয়া সম্ভব যা পেতে ২৫৬ টন কয়লা পোড়ানোর প্রয়োজন হয়। যেহেতু প্রতি বিভাজনে একাধিক ইলেকট্রন নির্গত  হয়, সেই নিউট্রনকে কাজে লাগিয়ে  আরও ইউরেনিয়াম নিউক্লিয়াসের বিভাজন ঘটানো যায়। এই ধরনের বিক্রিয়াকে শৃঙ্খল বিক্রিয়া বা চেন রিয়েকশন বলা হয় যার সাহায্যে অবিরাম স্বংক্রিয়ভাবে শক্তি তৈরি করা সম্ভব হয়।

error: Content is protected !!